যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও প্রধান বিচারপতির বৈঠক প্রসঙ্গে

শাহবাগ তৈরি হয়েছিল একরাশ ক্ষোভ থেকে। অন্যের দায় না নিয়ে আমার কথা বলি, আমার ক্ষোভ ছিল। সেই ক্ষোভ ট্রাইবুনালের বিরুদ্ধে ছিল না, সেই ক্ষোভ আসলে ছিল এই বিচার পরিচালনার ব্যাপারে অদক্ষতা এবং ইচ্ছাকৃত অবহেলার বিরুদ্ধে ক্ষোভ। তদন্ত সংস্থার প্রধান করা হয়েছিল ছাত্রসংঘের (ছাত্রশিবিরের পিতৃসংগঠন) এক নেতাকে, পরবর্তীতে যাকে বাদ দেয়া হয়। ট্রাইবুনালে প্রয়োজনীয় লোকবল না দেয়া, অবকাঠামোগত পূর্ণাঙ্গ সুযোগ সুবিধা না দেয়া এরকম হরেক অভিযোগ প্রতিনিয়ত ভেসে বেড়াচ্ছিল। তারপর যখন কাদের মোল্লার রায়ের পরে চোখের সামনে ভেসে আসল এই আইন এমন অদ্ভুতভাবে সংশোধন করা হয়েছে যে সেখানে খুনির অধিকার, আমরা মানে সাধারন ভিকটিম জনতার চাইতে বেশি-তারা আপীল করতে পারবে, আমরা পারব না- তখন ক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে এলো। কাদের মোল্লার ভি চিহ্ন দাবানলের প্রথম স্ফুলিঙ্গ, কিন্তু এই ক্ষোভ শুধুমাত্র আঙুল দেখানোর ক্ষোভ নয়, বিচার কাজের আশেপাশের অনেক অবহেলার বিরুদ্ধে ক্ষোভ।
যাই হোক, শত বাঁধাবিপত্তি পেরিয়ে বিচার এখন তার নিজের গতিপথেই চলছে। এই আইনে যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড, সুতরাং নির্যাতিত জনতা অবশ্যই চাইবে সর্বোচ্চ শাস্তিই নিশ্চিত হোক, ফাঁসি ছাড়া অন্য কোনো দাবিকে তাঁরা প্রত্যাশা করবে না।
অনেক সময়ই আমরা প্রত্যাশিত রায় পাই না। গোলাম আযম কিংবা সাঈদীর ফাঁসি না হওয়া এরকমই কিছু হতাশাজনক রায়। এর বিরুদ্ধে বিচারপ্রার্থী জনগন হিসেবে আমাদের ক্ষোভ থাকবে, বক্তব্য থাকবে সবই স্বাভাবিক-কিন্তু আদালতের এখতিয়ারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো সুযোগ নেই। অনেক সময় অনেক অপরাধের কথা আদালত ধারনা করলেও ফ্যাক্টস এন্ড ফিগারস দিয়ে যদি তদন্তকারী কর্মকর্তা সেটি প্রমান করতে না পারেন তাহলে আদালতের কিছুই করার থাকে না। আবার প্রমান করতে পারলেও আদালত যদি মনে করেন যে সেই অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি দিবেন না, সেটা আদালতের এখতিয়ার। অসন্তুষ্ট আমরা আপীল করতে পারি, আপীলের পরে রিভিউ করতে পারি-সবই পারি, কিন্তু আদালতের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি না, আদালত পক্ষপাতদুষ্ট এমন অভিযোগ তুলতে পারি না।

এতো কথা বলার পেছনে মূল কারন হচ্ছে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুীরের আপীলের রায় আগামী ২৯ জুলাই। যুদ্ধাপরাধীদের মাঝে আন্তর্জিতক যোগাযোগ বলেন, ধূর্ততা আর আর্থিক সামর্থ বলেন, গোলাম আযমের পরে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যক্তি। ট্রাইবুনালের কম্পিউটার থেকে রায়ের খসড়া সে আগেও চুরি করিয়ে প্রমান করেছে ধূর্ততা আর অসাধুতায় তার মতো দক্ষতা খুব কম লোকেরই আছে। এমন অবস্থায় সাংবাদিক স্বদেশ রায় গত ৬ জুলাই ভারতের একটি পত্রিকায় অভিযোগ করেছেন যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবার দেশের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করেছেন। বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগের জন্ম দেয়। খবরটি যদি সত্যিও হয়ে থাকে ( আমি ধরে নিচ্ছি মিথ্যা) তবে প্রধান বিচারপতি কার সঙ্গে দেখা করবেন কী করবেন না, এতটুকু বিবেচনাবোধ উনার নিশ্চয়ই আছে, এটা নিয়ে আমাদের একেবারের পেরেশান হয়ে পড়ার কিছু দেখি না।
আমরা অনেকেই এটিকে অনেক বড় করে দেখছি, যা ঠিক নয়।
প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কেউ দেখা করলেই অসৎ উপায়ে রায় পরিবর্তন হবে-এরকম বলা বা বিশ্বাস করা অত্যন্ত অনৈতিক।
আমাদের সর্বোচ্চ আদালত তাঁর নিজের মতো করে স্বাধীন মতামত নেবে। ইন্সটিটিউট হিসেবে এই আস্থা, এই বিশ্বাস আছে বলেই আমরা বিচারপ্রার্থী। বিচার না চাইলে তো শাহবাগ থেকে গিয়ে পাশের বঙ্গবন্ধু হাসপাতালের কেবিন থেকে গোলাম আযমকে বের করে পিটিয়েই মেরে ফেলত লাখো জনতা-সেটা তো করেনি। আমরা বিচার চাই, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা, বিবেচনাবোধ আর আইনের প্রতি সর্বোচ্চ আস্থা নিয়েই আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিচার চাই। এখানে বিচারিক প্রতিষ্ঠান ধ্রূব, অবিনাশী-সে প্রভাবিত হবে না, পক্ষপাতদুষ্ট হবে না-এই বিশ্বাস না থাকলে আর বিচার চাওয়ার দরকার কী?
আমরা যদি ইঙিত করি যে অমুকের সঙ্গে দেখা করে বা তমুকের সঙ্গে গল্প বলে রায় পরিবর্তন হয়-তাহলে আমাদের কথা আর জামায়াত-শিবিরের কথার মাঝে কোনো তফাৎ থাকে না।
আবেগ ভালো, আবেগ আমাদের চালিকাশক্তি, কিন্তু অতি আবেগে যেন রাগ করে জামায়াতিদের কথার প্রতিধ্বনি না করি, সে ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকা খুবই জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *