‘আমি মরি যাইরাম, আমারে কেউ বাঁচাও রে বা’

ভিডিওটা ভেসে আসা খবরের উপরে লেখা, ‘আমি মরি যাইরাম, আমারে কেউ বাঁচাও রে বা’।
আমি সিলেটের ছেলে, এ কথার শুধু অর্থ  জানি এমন নয়, এই শব্দগুলোর অন্তর্নিহিত ভাবগুলোও আমি জানি। কোনো একজন খুব অবাক বিষ্ময় নিয়ে চারপাশে তাকাচ্ছে, আশা নিয়ে তাকাচ্ছে, সে মৃত্যুর আগে সবাইকে জানাতে চায়, সে একটু পরেই মরে যাবে, চাইলেই যে কেউ তাঁকে বাঁচাতে পারে।
আহারে অবোধ শিশু, ক্লান্ত গলায় শেষবারের মতো আকূতি করে বলছে, ‌’আমারে কেউ বাঁচাও রে বা’।
কেউ একজন, মাত্র কেউ একজন আগালেই তাঁর মৃত্যুটা রদ হয়, মাত্র কেউ একজন থামো বললেই তার অনন্ত যাত্রাটা থেমে যায়। আরো কিছুদিন, আরো অনেকগুলো দিন, অনেকগুলো মাস-বছর সে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে সে টিকে থাকতে পারত, একটা চায়ের দোকান করত কিংবা ফেরি করে তরকারি বেচত অথবা হয়তো মালয়েশিয়া গিয়ে শ্রম বেচত অথবা অন্যকিছু হতো।
আজ সারাটাদিন বড্ড অগোছালো গেছে।
অফিসে কাজ করতে চাই-কানে ভাসে ‘আমারে কেউ বাঁচাও রে বা।’
সন্ধ্যায় ইফতার করতে গেছি এক জায়গায়, খাবার গলা দিয়ে নামে না, কানে ভাসে ”আমারে কেউ বাঁচাও রে বা।
খেলা দেখব বলে মিরপুরের দিকে যাই, খেলা দেখতে পারি না, কানে ভাসে ”আমারে কেউ বাঁচাও রে বা।  ভুলে থাকব বলে রসিকতা করতে চাই, একটা দুটো স্ট্যাটাস দিতে চাই, কিন্তু কানে ভাসে, ‘আমারে কেউ বাঁচাও রে বা।’ একুশ তাপাদারকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম, ভাবলাম অনেক্ষন বসে আড্ডা মারব, কিন্তু দুইমিনিট দাঁড়িয়ে থেকেই চলে আসি, কেউ একজন পিছন থেকে খালি বলে, ‘আমারে কেউ বাঁচাও রে বা।’
অনেকদিন আগে রাহেলার মামলাটা নিয়ে আমরা এই ব্লগ থেকে কাজ করেছিলাম। রাহেলা নামের মেয়েটিকে ধর্ষন করে জাহাঙ্গীর নগর ভার্সিটির পাশে গলা কেটে রেখে গিয়েছিল কিছু হায়েনা, রাহেলা মরেনি, ওভাবেই টিকে ছিল দুইদিন, শরীরে পিপড়া ধরেছিল, সেখান থেকে রাহেলা ঝোপের পাশে কাউকে দেখে সেই কাটা গলায় ফ্যাসফ্যাস করে বলেছিল, ‘ভাই, আমারে কেউ বাঁচান।’ হাসপাতালে যুদ্ধ করতে করতেও রাহেলা বাঁচেনি শেষপর্যন্ত, যদিও হত্যাকারীদের নাম বলে গিয়েছিল, তবু আইনের ফাঁক গলে খুনিরা শেষ পর্যন্ত সবাই ছাড়া পেয়ে গিয়েছিল।
সেই থেকে সাহসে চিড় ধরেছে, আত্মবিশ্বাস ফিকে হয়ে গেছে, বিচারের দাবি করার সাহস পাই না, শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার শপথ নিতে দ্বিধা হয় রাহেলার পর থেকেই।
শুধু ভাবি, খুব গহীন গভীরে এই পুরো জাতি এক অদ্ভুত মনোবৈকল্যে ভুগছি। সকলের মাঝে গভীর অসুখ, এক অদ্ভুত হিংসাপ্রিয় জাতি আমরা।
এখানে কারো প্রতি কারো মমতা নেই।
রাস্তায় একটু ধাক্কা লাগলেই আমরা খেঁকিয়ে উঠি পরষ্পরের প্রতি।
নিয়মিত ইন্টারনেটে ঢুকে পরষ্পরের প্রতি বিষোদগার উগরে দেই।
এইখানে আহত একুশ তাপাদার যখন হাচড়ে পাচড়ে রাস্তায় উঠে একজনকে মিনতি করে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে, সেই লোক ‘কাজ আছে’ বলে অনায়াসে চলে যায় মোটরসাইকেল হাকিয়ে।
এখানে আমরা মানুষ পোড়াই, মানুষ গুম করে মেরে ফেলি-তারপর সেই মৃত্যুগুলো নিয়ে বীভৎস উল্লাস বোধি নিজেদের গহীনে।
আমি আজ রাতে ঘুমাতে পারব না, আজ রাতে বারবার শুনব ‘আমারে কেউ বাঁচাও রে বা।’
কিন্তু কাল রাতে ঠিকই ঘুমাব, পরশুদিনও।
আবার উল্লাসে মাতব, এমনকি হাতের কাছে পেলে আমিও হয়তো পিটিয়ে মেরে ফেলব আরেকটা শিশুকে।
শুধু ছোট্ট রাজন নয়, গোটা জাতি মিনতি করে বলছে, ‘আমি মরি যাইরাম, আমারে কেউ বাঁচাও রে বা’-আমরা জাতির সন্তান, নিজেরা জঙ্গলের পশুর মতো নিজেদের ভেতরে কুৎসিত প্রতিহিংসা আর মমত্বহীন বোধ নিয়ে দুইপেয়ে পশুর পাল,
শুধু ফেসবুকের স্ট্যাটাসে নিজেকে মহৎ প্রমানের দিনমান চেষ্টা করে যাব।
আমরা কেউ কান পেতে শুনব না, আমরা প্রত্যেকেই মরে গেছি, আমরা প্রত্যেকে পশু হয়ে গেছি, আমাদের মনের অনেক গহীনে মনুষত্ব কেঁদে কেঁদে বলছে, ‘আমি মরি যাইরাম, আমারে কেউ বাঁচাও রে বা’।
সেই বোধ যদি না জাগে, তাহলে আমরা নিজেরাই রাজন হয়ে যাব একদিন;
এই শোক, এই ক্রোধ, এই অশ্রু কোনো গন্তব্যে পৌঁছাবে না, শুধু ফেসুবুকের স্ট্যাটাস বুদবুদ হয়ে শূন্যেই মিলিয়ে যাবে।

9 thoughts on “‘আমি মরি যাইরাম, আমারে কেউ বাঁচাও রে বা’

  1. Mahaboob Soheil

    সবাই বলে বিচার চাই, বিচার চাই। বিচার ছাড়া প্রায় প্রতিদিন কত মানুষকে চোর সন্দেহে পাবলিক পিটিয়ে মেরে ফেলতেছে, নাহয় আরও চাইরটা মারবে। বিচারিক প্রক্রীয়ায় গেলে দেখা যাবে ওদের মতন ফেরেস্তা এই দুনিয়ায় হাতে গোনা দুই একটা পাওয়া যাইতে পারে। মারা গেছে ছেলেটার মা বাবাকে দুই তিন লক্ষ টাকা দিয়ে আপোষ করে ফেলবে। কারণ টাকা পেলে গরীবের যুক্তি হবে যে গেছে সেতো আর ফিরে আসবে না।

  2. Pingback: A 13-Year-Old Boy’s Horrific Death Becomes Viral Facebook Video in Bangladesh · Global Voices

  3. Sohel Kamrul

    রাহেলার খবর টা ভুলে গেছিলাম ! আপনার লেখায় বিষয়টা জানলাম অদম্য জীবনিশক্তি দিয়ে শুধু খুনিদের নাম গুলো প্রকাশ করার জন্য সে কটাদিন বেচে ছিলো, আইনশৃংখলা বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থার ফাক ফোকর গলে খুনিরা রাহেলার অদম্য স্পৃহাকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে মুক্ত হয়ে গেলো !!! আহ খোদা ? এই সময়ে এই দেশে মহান আল্লার দরবারে ন্যয়বিচারের ফরিয়াদ করা ছাড়া আরতো উপায় দেখছিনা জনাব আরিফ জেবতিক সাহেব !!!!!

  4. Mahboob

    অসাধারণ আপনার অনুভূতির প্রকাশ। আমারও তাই মনে হয়। আমরা সবাই রাজনের মত মরে যাইবাম, শুধু বেচে থাকবে হৃদয়হীন মানবপশু। এই অত্যাচারের সময় নিশ্চয় অনেক লোকজন আশপাশে ছিল, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসে নাই।

  5. Pingback: Nagranie wideo ukazujące okropną śmierć 13-letniego chłopca w Bangladeszu rozprzestrzenia się bardzo szybko na Facebooku · Global Voices po polsku

  6. A Human

    This Horrific story wakes me up at night. I still didn’t see this horrific video because I know myself that I will not able to tolerate.
    This is happing everyday somewhere in the world and particularly in Bangladesh.
    I think government of Bangladesh should implement a very tough law violence against children and women.
    My desire is for now, all these perpetrator must get death patently, as soon as possible (not years from now) and this event should take place where Rajon was beaten to death in front of the public and the media. This will be some what comforting for us. Also Rajon was the bread earner, there should some financial compensation from the perpetrator’s family..

  7. m ahmed

    This Horrific story wakes me up at night. I still didn’t see this horrific video because I know myself that I will not able to tolerate.
    This is happing everyday somewhere in the world and particularly in Bangladesh.
    I think government of Bangladesh should implement a very tough law violence against children and women.
    My desire is for now, all these perpetrator must get death patently, as soon as possible (not years from now) and this event should take place where Rajon was beaten to death in front of the public and the media. This will be somewhat comforting for us. Also Rajon was the bread earner, there should some financial compensation from the perpetrator’s family, the court should arrange this.

  8. Pingback: A 13-Year-Old Boy’s Horrific Death Becomes Viral Facebook Video in Bangladesh | Freedom, Justice, Equality News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *